প্রতিবেদক: রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা তালহা জুবায়ের প্রায়ই অনলাইনে পণ্য অর্ডার করেন। কখনো অফিসে, আবার কখনো বাসায় ডেলিভারির ঠিকানা দেন। কিন্তু অনেক সময় ডেলিভারিম্যান পণ্য নিয়ে পৌঁছালে তিনি সেখানে থাকেন না, ফলে পণ্য ফেরত চলে যায়। এতে সময় ও ঝামেলা দুই–ই বাড়ে। তবে এখন আর এমন চিন্তা করতে হয় না। তিনি ব্যবহার করছেন ‘ডিজিবক্স’–এর ডিজিটাল লকার সেবা, যেখানে পণ্য পৌঁছানোর পর গ্রাহক ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সুবিধাজনক সময়ে সংগ্রহ করতে পারেন। সেবার মাশুলও প্রচলিত ডেলিভারির অর্ধেকেরও কম, আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় টু–ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন কোডের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে এই ডিজিটাল লজিস্টিক প্রযুক্তি সেবা নিয়ে এসেছে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিবক্স’। বর্তমানে দেশের ৫৫টি স্থানে ডিজিবক্সের সেবা পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার লকার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৬টি, আর বাকি লকারগুলো রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট ও চট্টগ্রামে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত সাত লাখেরও বেশি গ্রাহককে সেবা দিয়েছে। রাজধানীর সব মেট্রোস্টেশনে ডিজিবক্সের লকার রয়েছে, যার ৬০ শতাংশ সেবা দিচ্ছে ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজ বাংলাদেশ।
ডিজিবক্সের সেবাটি ব্যবহারে প্রক্রিয়াটিও বেশ সহজ। অনলাইনে অর্ডার করার সময় গ্রাহক যদি ডেলিভারি অপশন হিসেবে ডিজিবক্স নির্বাচন করেন, তবে ডেলিভারিম্যান পণ্যটি গ্রাহকের নিকটস্থ লকারে রেখে যান। এরপর গ্রাহকের মুঠোফোনে একটি ওটিপি কোড পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রাহক কোডটি ব্যবহার করে লকার খুলে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। বর্তমানে ঢাকার জিগাতলা, মোহাম্মদপুর, আইসিটি ভবন, পূর্বাচল, গুলশান–২ ও তেজগাঁওয়ে এবং চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ হোটেলের নিচে ডিজিবক্সের লকার স্থাপন করা আছে। প্রতিটি পয়েন্ট দিনে গড়ে ৩০০ জন গ্রাহককে সেবা দিতে সক্ষম।
ডিজিবক্সের প্রতিটি ইউনিটে রয়েছে এটিএম বুথের মতো স্ক্রিন। সেখানে ‘রাইডার’ ও ‘কাস্টমার’ নামে দুটি অপশন থাকে। ডেলিভারিম্যান পণ্য রাখতে গেলে ‘রাইডার’ অপশন ব্যবহার করেন, আর গ্রাহক পণ্য নিতে ‘কাস্টমার’ অপশন ব্যবহার করেন। মুঠোফোন নম্বর বা ই–মেইল দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওটিপি কোড পাঠানো হয়। কোডটি দিলে লকার খুলে যায় এবং গ্রাহক পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
এই সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে তৈরি। ডিজিবক্সের চেয়ারম্যান মোরশেদুল আলম বলেন, এই সেবার মাধ্যমে ডেলিভারি চার্জ ও ঝামেলা কমেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে তারা বক্সের সংখ্যা ২৫ হাজারে উন্নীত করতে চান, যাতে ই–কমার্স খাতে ডেলিভারি সেবার গতি আরও বাড়ে।
বর্তমানে দারাজ বাংলাদেশ ও ১০০০ ফিক্স সার্ভিস—এই দুটি প্রতিষ্ঠান ডিজিবক্সের সেবা নিচ্ছে। দারাজ বর্তমানে ৩৩টি লকারের মাধ্যমে গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহ করছে, যার মধ্যে ২৯টি ঢাকায় এবং বাকি চারটি রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও চট্টগ্রামে। দারাজের গ্রাহকরা ডিজিবক্সের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় তাঁদের পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। প্রচলিত ডেলিভারিতে যেখানে চার্জ ৭০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত, সেখানে ডিজিবক্সে এই খরচ ২২ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে সীমিত। দারাজের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তারা এই সেবা বিশ্ববিদ্যালয়, পার্ক, অফিস কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, ‘১০০০ ফিক্স সার্ভিস’ মূলত মোবাইল, ল্যাপটপ, ডেস্কটপসহ স্মার্ট ডিভাইস সার্ভিস দেয়। তারা ডিজিবক্সের মাধ্যমে আলাদা ডিজিটাল সিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে গ্রাহকরা নির্দিষ্ট বক্সে ডিভাইস জমা দিতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ইমেজ রিকগনিশন সিস্টেম ডিভাইস শনাক্ত করে, তথ্য নথিভুক্ত করে এবং নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করে। সার্ভিস শেষে খুদে বার্তার মাধ্যমে গ্রাহককে জানানো হয়, এরপর তিনি একইভাবে ওটিপি কোড দিয়ে ডিভাইস সংগ্রহ করতে পারেন। বর্তমানে শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, ফার্মগেট, মতিঝিল ও মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে এই সেবা চালু আছে। স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রিজওয়ানুল হক জানিয়েছেন, শিগগিরই চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটেও এই সেবা চালু করা হবে।
ডিজিবক্স বাংলাদেশের ই–কমার্স ও লজিস্টিক খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় সময়, খরচ ও অনিশ্চয়তা কমিয়ে এই প্রযুক্তি সেবা ক্রেতা–বিক্রেতা উভয়ের জন্যই হয়ে উঠেছে একটি স্মার্ট সমাধান।