প্রতিবেদক: বাজারে সম্প্রতি এক নতুন ধরনের ডাল নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে—এর নাম ‘মথ ডাল’। কিন্তু এই ডাল নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে, কারণ মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি হওয়া অনেক ডালেই ক্ষতিকর রং মেশানো হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বাজার থেকে ডালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর দেখেছে, মুগ ডালের নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৮টিতে টারটাজিন নামের হলুদ রং পাওয়া গেছে। এরপরই সংস্থাটি ক্রেতাদের সতর্ক করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে প্রচার করে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে মথ ডালের কোনো উৎপাদন নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মথ ডাল একটি খরা সহনশীল ডালজাতীয় ফসল, যা মূলত ভারতের স্থানীয় ফসল। বিশ্বের ৯৫ শতাংশ মথ ডাল উৎপাদন হয় ভারতের রাজস্থানে। ২০২৩–২৪ মৌসুমে রাজস্থানে ৪ লাখ ১৯ হাজার টন মথ ডাল উৎপাদিত হয়। সেখানে এই ডাল বেশ জনপ্রিয় এবং পাঁপড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভারতের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত আকারে এই ডাল চাষ হয়, যুক্তরাষ্ট্রে এটি মূলত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মথ ডাল আমদানি হয়। রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিল হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের রাজস্থান থেকে ৬২ টন মথ ডালের প্রথম চালান আমদানি করে। ২০২৪ সালে মোট ৮ হাজার ৫১৬ টন মথ ডাল দেশে আসে। কিন্তু ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে অক্টোবর পর্যন্ত ২০ হাজার ৬৯১ টনে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে মথ ডাল আমদানি করছে, মূলত ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে।
বিএফএসএ কর্মকর্তাদের মতে, মুগ ডাল কিছুটা গোলাকার এবং মথ ডাল কিছুটা লম্বা হলেও রং মেশানোর পর দুটি আলাদা করা কঠিন। ব্যবসায়ীরা বেশি দামের আশায় কমদামি মথ ডালকে হলুদ রং মিশিয়ে মুগ ডাল নামে বিক্রি করছেন। মুগ ডাল আমদানিতে কেজিপ্রতি দাম পড়ছে প্রায় ১৩৩ টাকা, আর মথ ডালে ১০৪ টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি ২৯ টাকার পার্থক্য রয়েছে। ফলে বাজারে মুগ ডালের পরিবর্তে মথ ডাল বিক্রি বেড়েছে। বর্তমানে খুচরায় মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০–১৬০ টাকায়, আর মথ ডাল মুগ ডাল নামে বিক্রি হচ্ছে ১৩০–১৪০ টাকায়।
পরিসংখ্যান ব্যুরো ও এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয় এবং ৩০ হাজার টন আমদানি করা হয়। কিন্তু মথ ডাল আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে মুগ ডালের আমদানি দ্রুত কমে গেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২১ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হলেও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা কমে ১৮ হাজার টনে দাঁড়ায়। ওই বছর মথ ডালের আমদানি ছিল ৯৯৬ টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি আরও কমে ১০ হাজার ৯১৩ টনে নেমে আসে, বিপরীতে মথ ডাল আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪১৪ টনে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে মাত্র ২১৩ টন মুগ ডাল আমদানি হয়েছে, যেখানে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।
রং মিশিয়ে ডাল বিক্রির অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইল শহরের ছয়আনী বাজারে অভিযান চালিয়ে দুই ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, ডাল বা যেকোনো শস্যদানায় রং মেশানোর অনুমোদন নেই। টারটাজিন রঙে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় আমদানির সময় রং পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং রং মেশানো ডাল যাতে আমদানি না হয়, সে বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘মথ ডাল’ বাংলাদেশে একেবারে নতুন ফসল। কিন্তু রং মেশানো ও ভুলভাবে বিক্রির কারণে এটি এখন খাদ্য নিরাপত্তার বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। তাই ভোক্তাদের উচিত ডাল কেনার সময় রং বা আকারে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন আছে কিনা তা খেয়াল করা এবং সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।