প্রতিবেদক: যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব টের পেতে শুরু করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি, বিভিন্ন সংস্থার জরিপে ধারণা করা হচ্ছে যে জুলাই মাসে ভোক্তামূল্য সূচক (সিপিআই) বাড়বে, তবে জুনের তুলনায় বৃদ্ধির হার কিছুটা কম হবে। রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের জরিপ অনুযায়ী, জুলাইয়ে সিপিআই ০.২% বাড়তে পারে, যা জুনে ছিল ০.৩%। এই পরিসংখ্যান ট্রাম্পের নতুন ‘পারস্পরিক’ শুল্কব্যবস্থা চালু হওয়ার আগের শেষ পূর্ণ মাসের তথ্য। ৭ আগস্ট থেকে তাঁর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়েছে, যদিও কিছু শুল্ক এরই মধ্যে আদায় শুরু হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে বাজারে অস্থিরতা চলছে; ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিনিধিরা নানা শুল্ক প্রস্তাব দিয়ে আবার তা পরিবর্তন করেছেন, কখনো জোরদারভাবে তা আরোপ করেছেন।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের আমদানি শুল্ক আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। তাঁদের ধারণা, ডিসেম্বর নাগাদ বার্ষিক সিপিআই ৩.৩% হতে পারে, যেখানে শুল্ক ছাড়া এটি ২.৫% থাকত। অর্থাৎ শুল্ক একাই ০.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে গৃহস্থালি পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দাম বাড়তে থাকায় মার্কিন ভোক্তাদের কেনাকাটার অভ্যাস বদলাচ্ছে এবং অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনদের অর্ধেকের বেশি খাদ্যের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ৫৩% মানুষ বলেছেন, গৃহস্থালি পণ্যের দাম তাঁদের জন্য বড় ধরনের চাপ, ৩৩% মাঝারি চাপ, আর ১৪% কোনো দুশ্চিন্তা নেই। জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, খাদ্যের দাম ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে মানুষের অস্থিরতা এখনো কাটেনি, যদিও খাদ্যের প্রভাব মুদ্রাস্ফীতিতে কিছুটা কমেছে।
গৃহস্থালি পণ্যের মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালে ৯.৪% এ উঠলেও বর্তমানে তা অনেক কমে জুন পর্যন্ত বছরে ২.৪% হয়েছে। তবে ডিম, গরুর মাংস, কমলার রসের মতো কিছু পণ্যের দাম এখনো বেড়ে চলেছে সরবরাহ সংকট বা চরম আবহাওয়ার কারণে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে বিদেশি ফল, টিনজাত খাবার, কফি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের দামও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড ওর্তেগা মনে করেন, দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ভোক্তাদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খাদ্যসংক্রান্ত মনোভাবে প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি ভোক্তা আস্থা টালমাটাল করে দিয়েছে। কর্মসংস্থান ও ব্যয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অর্থনীতিকে প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল দেখাচ্ছে। বছরের শুরু থেকেই শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে দাম বৃদ্ধির শঙ্কা ছিল, যদিও এখনো তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে আছে কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করছে এবং আমদানি করা মজুত শেষ হয়নি।
তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা—মজুত শেষ হয়ে গেলে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কের চাপ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে দাম দ্রুত বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে জুনে মার্কিন ব্যবসায়ীদের আমদানি কমেছে, কারণ শুল্ক বাড়ায় বিদেশি পণ্য কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ক্রেতারা কেনাকাটার ধরন বদলে ছোট পণ্য কিনছেন, কুপন ব্যবহার করছেন, অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিচ্ছেন, ঘরে বেশি খাচ্ছেন—যা অর্থনৈতিক মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সব শ্রেণির ভোক্তারা সতর্কভাবে খরচ করছেন। অনেক ব্র্যান্ড গ্রাহক ধরে রাখতে প্রচারণা চালাচ্ছে, নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্যের পরিধি বাড়াচ্ছে। যেমন, ওরিও ও চিপস আহয়ের মালিক মন্ডেলেজ জানিয়েছে, মানুষ স্ন্যাকস, বিশেষ করে বিস্কুট কম কিনছেন, ফলে উত্তর আমেরিকায় বিক্রি গত প্রান্তিকে ৩.৫% কমেছে। সিইও ডির্ক ভ্যান দে পুট বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ ও হতাশা স্পষ্ট।
শ্রমবাজারও ধীরগতির লক্ষণ দেখাচ্ছে। জুলাইয়ে মাত্র ৭৩ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে কম এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে প্রয়োজনীয় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখের নিচে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রত্যাশিত হারে কর্মসংস্থান না হওয়া মানে বিনিয়োগ কমছে, বাজার সংকুচিত হচ্ছে।