চীন, রাশিয়া ও ভারতের জোটে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচাপের প্রতিবাদ

প্রতিবেদক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, সমরাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে বাণিজ্য দিয়ে যুদ্ধ করাই শ্রেয়। তিনি বাণিজ্যকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছেন। কোনো দেশের উত্থান ঠেকাতে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি ব্যবহার এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের তৈরি মুক্তবাণিজ্যব্যবস্থার পরিপন্থী হলেও, বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে তারা তা-ই প্রয়োগ করছে।

শুল্কনীতি এখন কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ভারতের ওপর শুল্কচাপ—সবই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে কূটনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার উদাহরণ। কিন্তু এই নীতি উল্টো প্রভাব ফেলেছে। রাশিয়া-চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইউক্রেন যুদ্ধের পর অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে, আর ভারতও ধীরে ধীরে এই সমীকরণে যুক্ত হচ্ছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রাখলেও রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল তেল আমদানি করছে এবং চীনের সঙ্গে ব্রিকসে সক্রিয়। ট্রাম্পের শুল্কচাপের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া-ভারত-চীনের মধ্যে কৌশলগত সমঝোতা তৈরি হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন রাশিয়া-চীন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে, তেমনি বর্তমান বাণিজ্যনীতি ভারত-চীন সম্পর্কও নিকটতর করতে পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় প্রতিযোগিতা ছিল সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতায়; কিন্তু ২০২০-এর দশকে অর্থনীতি ও প্রযুক্তিই প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও বাজারে প্রবেশাধিকার এখন প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার উপায়। রাশিয়া-চীন-ভারত বুঝতে পারছে যে একা একা এই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তাই যৌথ প্রকল্প, মুদ্রা বিনিময় ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় এগোচ্ছে।

তত্ত্বে মুক্তবাজার হলো সীমাহীন সেতু, যেখানে প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবে বাণিজ্য প্রাচীর বা অস্ত্রে পরিণত হয়। শুল্ক, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কিংবা কৌশলগত বাজার প্রবেশাধিকার—সবই রাজনৈতিক হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার নীতি এ সত্য স্পষ্ট করে।

ট্রাম্পের ভারতের প্রতি সাম্প্রতিক আচরণ থেকে বোঝা যায়, নীতির মূল লক্ষ্য উদীয়মান অর্থনীতিকে আটকে দেওয়া। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও পরে চীনের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধেও এখন একই মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও আস্থার ঘাটতি থাকলেও তাদের জনসংখ্যা ২৮০ কোটির বেশি এবং প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে উভয়ই শক্তিশালী। এই সম্পর্ক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। জেফরি স্যাক্সের মতে, ভারতকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ষষ্ঠ স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়াই উচিত, তবে এর জন্য আস্থা পুনর্গঠন জরুরি।

ভূ-অর্থনীতি হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার রাজনীতি পরিচালনা। ভারত-চীন-রাশিয়ার একতা বিশাল বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রযুক্তি সমন্বয়ে পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। যদিও সীমান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস আছে, তবুও এই সহযোগিতা বহুপক্ষীয় বিশ্বে নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।

রাশিয়া-চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠতা কেবল অর্থনৈতিক জোট নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভূরাজনৈতিক বার্তা। পশ্চিমা চাপ বাড়লে এই সমন্বয় আরও গভীর হতে পারে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলবে।