প্রতিবেদক: রাজধানীর মগবাজারে বর্তমানে ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পাশের পাঁচ কাঠা জমিতে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৯২০ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করা যায়। তবে ভবিষ্যতে একই জমিতে ১১ হাজার ৫২০ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণের সুযোগ মিলবে। ভবনের আয়তনের মতো ফ্ল্যাট বা ইউনিটের সংখ্যাও ৯–১০ থেকে বেড়ে হবে ১১টি।
রাজধানীর নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের মাধ্যমে এভাবেই বিভিন্ন এলাকার ভবনের উচ্চতা ও আয়তন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে ড্যাপ রিভিউ–সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। এতে অভিজাত এলাকার সঙ্গে সাধারণ এলাকার ভবনের আয়তন নিয়ে বৈষম্য কমে আসবে বলে মনে করছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্তে আবাসন ব্যবসায় গতি ফিরবে। তবে পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, দ্বিতীয় দফার এই সংশোধনীতে ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংশোধিত ড্যাপে রাজধানীকে আগের ২৭৫টি জনঘনত্ব ব্লকের পরিবর্তে ৬৮টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। ২০ ফুট বা তার বেশি প্রশস্ত সড়কের পাশের আবাসিক ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর বা ফার) বা আয়তন বাড়ানো হয়েছে। তবে ২০ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত সড়কসংলগ্ন ভবনের আয়তন বাড়বে না। ২০ ফুট সড়কের পাশের ভবনের আয়তনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটের সংখ্যাও বাড়বে। যদিও পুরান ঢাকায় একটি ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও অন্যান্য এলাকায় তা ১ থেকে ৩টি পর্যন্ত বাড়বে।
গত ১৯ অক্টোবর উপদেষ্টা কমিটির সভায় ড্যাপের সংশোধনী নীতিগত অনুমোদন পায়। একই দিন ‘ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা–২০২৫’–এরও অনুমোদন দেওয়া হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগিরই ড্যাপের সংশোধনী ও নতুন বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
চূড়ান্ত হওয়া ‘ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা–২০২৫’–এ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ৫ কাঠার বেশি জমিতে ভবন নির্মাণ করলে বর্জ্য পরিশোধনাগার (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগে ভবনের নকশা অনুমোদনের আগে ফি জমা দিতে হতো, এখন নকশা অনুমোদনের সুপারিশের পর ফি দিতে হবে। এছাড়া আগে ভবন ব্যবহার বা অকুপেন্সি সনদ পাঁচ বছরের জন্য দেওয়া হতো, এখন নকশায় কোনো পরিবর্তন না হলে সেটি আজীবনের জন্য কার্যকর থাকবে। বড় প্রকল্পের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও আগে দুই কমিটি কাজ করত, এখন একটি কমিটি অনুমোদন দিলেই হবে।
রাজউকের উপনগর পরিকল্পনাবিদ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ড্যাপ সংশোধন এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়। আগে কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত থাকলে শর্তসাপেক্ষে হাসপাতাল বা স্কুল–মাদ্রাসা করার অনুমোদন মিলত। এখন আর সেই সুযোগ রাখা হয়নি।”
ঢাকা মহানগরসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে ২০২২ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য প্রণীত এই মহাপরিকল্পনাটি ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। ড্যাপ প্রণয়নের পর থেকেই আবাসন ব্যবসায়ীরা সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০২৩ সালে এক দফা সংশোধন করা হলেও ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ডিসেম্বরে সরকার নতুন করে ড্যাপ রিভিউয়ের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে।
সংশোধিত ড্যাপে ভবনের আয়তন এবং ফ্ল্যাটের সংখ্যা উভয়ই বাড়ছে। ড্যাপ সংশোধনীতে সড়কের প্রশস্ততার ফারের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক ফার এবং আবাসন ইউনিটের হারও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণত সড়কের প্রশস্ততা ও এলাকাভিত্তিক ফারের মধ্যে যেটি কম থাকে, সেটি ধরে ভবনের আয়তন নির্ধারণ করা হয়।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ৬ থেকে ৮ ফুট প্রশস্ত সড়কের ফার ১.৫ থেকে কমিয়ে ১.২৫ করা হয়েছে। ৮ থেকে ১২ ফুট, ১২ থেকে ১৬ ফুট এবং ১৬ থেকে ২০ ফুটের কম প্রশস্ত সড়কের ফার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পাশের ভবনের ফার ২.৭৫ থেকে বাড়িয়ে ৩.২৫ এবং প্রায় ৩০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পাশের ভবনের ফার ৩.২৫ থেকে বাড়িয়ে ৩.৫০ করা হয়েছে।
যেসব এলাকায় ফার বেশি বেড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—কড়াইলে ০ থেকে ২, মিরপুরে ২.৮ থেকে ৩.৪, দক্ষিণখানে ২ থেকে ৩.১, শেওড়াপাড়ায় ২ থেকে ৩, মহাখালীতে ২.২ থেকে ৩.৩, মোহাম্মদপুরে ২.৭ থেকে ৩.৪, পুরান ঢাকায় ২.৬ থেকে ৩.৩, বাসাবো–খিলগাঁওয়ে ২ থেকে ৩.৪, সাভারে ২ থেকে ৩.৪, মিরপুর ডিওএইচএসে ২.৫ থেকে ৪.৮ এবং খিলক্ষেত আবাসিক এলাকায় ২ থেকে ৪.৪।
সংশোধিত ড্যাপ অনুযায়ী, আবাসন ইউনিটের সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করা হয়েছে মহাখালীতে ২ দশমিক ৫, যা আগে ছিল ১ দশমিক ৯। এ ছাড়া পুরান ঢাকায় ১.২ থেকে ২.৪, মিরপুরে ১.৭ থেকে ১.৯, মোহাম্মদপুরে ১.৭ থেকে ২.২, শেওড়াপাড়ায় ১.৩ থেকে ১.৯, আফতাবনগরে ১.৪ থেকে ১.৭, পূর্বাচলে ১.৬ থেকে ১.৯, কেরানীগঞ্জে ১.২ থেকে ২ এবং নিকেতনে ১.২ থেকে ১.৮ করা হয়েছে। আবাসন ইউনিটের সর্বনিম্ন হার সাতারকুল–নাসিরাবাদ ও কাউন্দিয়া–আমিনবাজারে ১ দশমিক ৩।
বর্তমানে মোহাম্মদপুরে ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পাশের ৫ কাঠা জমিতে ৯ হাজার ৭২০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যায়, যার ফ্ল্যাট সংখ্যা হয় ৮ থেকে ৯টি। সংশোধিত ড্যাপ কার্যকর হলে একই জমিতে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করা যাবে এবং সেখানে সর্বোচ্চ ১১টি ফ্ল্যাট করা সম্ভব হবে।
রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “নতুন ড্যাপ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার বাইরের অন্য এলাকার জমির মালিকেরা আবাসন কোম্পানিগুলোকে জমি দিচ্ছিলেন না। কারণ, আগের ড্যাপে ভবনের আয়তন ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল। এতে আবাসন খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। এখন ড্যাপ সংশোধন হওয়ায় এই স্থবিরতা কাটবে এবং খাতে নতুন গতি আসবে।