প্রতিবেদক: হাঁস মানেই পানি—এ ধারণা বদলে দিতে যাচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট অ্যাগ্রো। ফ্রান্স থেকে আমদানি করা এমন এক নতুন হাঁসের জাত দেশে এনেছে তারা, যাকে পানি ছাড়াই শুকনা জায়গায় বা মাচার ওপর পালন করা যায়। মাত্র ৪৫ দিনেই প্রতিটি হাঁসের ওজন প্রায় ৩ কেজি পর্যন্ত হয়। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে নতুন এই হাঁসের জাত প্রদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রাণিসম্পদ সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারি, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং প্রাণিসম্পদ খাত–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ৫ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন খামারি ও উদ্যোক্তাকে ব্রোঞ্জ, রৌপ্য ও স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।
‘দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫ উদ্যাপন করা হচ্ছে। আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ৩০ টাকার টিকিটে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন।
প্রথম দিনে প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, প্রাণিখাদ্য, মুরগির বাচ্চা, ডিম, জৈব সার ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের স্টল রয়েছে। বড় তাঁবুতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিভাগও রয়েছে। দেশি-বিদেশি গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল ও পাখির নানা প্রজাতি প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চিংড়ির খাবারসহ নতুন নতুন পণ্য ও প্রযুক্তিও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
দেশে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত প্ল্যানেট অ্যাগ্রো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. শাহরিয়ার জানান, প্রদর্শনীতে তারা এক দিন বয়সী ১৫–২০ হাজার হাঁসের বাচ্চা বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন। এসব বাচ্চা তাদের যশোরের হ্যাচারিতে উৎপাদন করা হয়।
চিংড়ির খাবারের বাজারেও এসেছে নতুন অগ্রগতি। দেশে বাগদা চিংড়ির একটি বড় অংশের খাবার আমদানি করা হলেও আগস্ট থেকে আস্থা ফিড নামে একটি প্রতিষ্ঠান দেশে উচ্চমানের চিংড়ির খাদ্য উৎপাদন শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ডিজিএম মীর রাইসুজ্জামান জানান, প্রথম মাসেই তারা ২০০ টন খাবার বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজির দাম ৭০ থেকে ৯০ টাকা, যা আমদানি করা খাদ্যের চেয়ে ৮–১০ টাকা কম। আগামী দুই বছরের মধ্যেই চিংড়ির খাবার আমদানির প্রয়োজন থাকবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আস্থা ফিড গরুর খাবার ‘সুইট ভুসি’ও প্রদর্শন করছে। খামারিদের কম খরচ ও অভ্যাস বিবেচনায় এতে প্রোবায়োটিক ও স্বাদ বাড়ানোর উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে নারিশ অ্যাগ্রো দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাসে এক লাখ টন ফিড বিক্রির মাইলফলক অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপক আদাল উদ্দীন রাঙ্গা জানান, তারা অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করেন বলেই চাহিদা বেশি। আগামী বছর তারা পেট ফুড উৎপাদনেও যাচ্ছে।
এদিকে প্যারাগন প্রায় এক হাজার খামারি নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ডেইরি খামার গড়ে তুলেছে। এসব খামারের দুধ দিয়ে তারা ঢাকায় ২৬টি এবং সারা দেশে প্রায় ৪০টি ‘প্যারাগন মার্ট’ পরিচালনা করছে। প্রদর্শনীতে প্রক্রিয়াজাত খাবারে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা ৮৫ হাজার ২২৭টি, আর প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার পোলট্রি খামার। উৎপাদনশীলদের অবদান নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার কৃষিজমিতে কীটনাশক ব্যবহার ও তামাক চাষের পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধের বিষয়টিও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
শুক্রবার ছুটির দিনে প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীর ভিড় আরও বাড়বে বলে আশা করছে আয়োজকেরা।