প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদমর্যাদা দেশের একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান করার প্রস্তাব এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব কমানো এবং গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া ‘সার্চ কমিটি’-এর সুপারিশের ভিত্তিতে করার খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৫-এ এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ সংক্রান্ত খসড়া সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
গভর্নর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বিদ্যমান বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধন করে এই অধ্যাদেশ কার্যকর করা হবে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে অতীতের ভুল ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে দৃঢ় আইনগত ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। বর্তমানে গভর্নরের অবস্থান সচিবদের ওপর হলেও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নিচে, এবং অ্যাটর্নি জেনারেল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে সমমর্যাদায় রয়েছে।
গভর্নর পদে মন্ত্রীর সমান মর্যাদা পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, নীতিগত স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক হবে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা মন্ত্রীর সমান মর্যাদা ভোগ করেন। অধ্যাদেশের খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি তিনজন থেকে কমিয়ে একজন করার এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সংখ্যা ছয়জন করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের নিয়োগ পদ্ধতিকে স্বচ্ছ ও পেশাদার করার জন্য তিন সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটি সাবেক অর্থমন্ত্রী/উপদেষ্টা, পরিকল্পনামন্ত্রী/উপদেষ্টা অথবা সাবেক গভর্নর হতে নেতৃত্ব দেবে। পাশাপাশি, অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
খসড়া অধ্যাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব জনবল, বেতন কাঠামো ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ স্বায়ত্তশাসিতভাবে করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধে একটি আধুনিক সমন্বিত তদারক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিধি প্রণয়ন ক্ষমতা সংযোজনের প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে তিন কোটি টাকা। খসড়া অধ্যাদেশে এটিকে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সাবেক ব্যাংকাররা বলেছেন, গভর্নরের ক্ষমতা বাড়ালে জবাবদিহি কোথায় থাকবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, পদমর্যাদা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়; দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন হচ্ছে কি না সেটিই প্রধান বিষয়। অতিরিক্ত স্বাধীনতা স্বৈরাচারী বা অতি ক্ষমতাশালী হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে, তাই জবাবদিহি কাঠামো স্পষ্ট রাখা অত্যাবশ্যক।