প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতিতে যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে ব্যাংকিং খাতে কিছু দৃশ্যমান উন্নতি এসেছে। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে, রিজার্ভ বেড়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হয়নি। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দূর করার কিছু উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে, যার প্রধান কারণ হলো বিনিয়োগের ঘাটতি। বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে গিয়ে ছাঁটাই শুরু করলে সাধারণ মানুষের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়। শেয়ারবাজারের বেশ কিছু কোম্পানি লভ্যাংশ না দেওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ডলারের স্থিতিশীলতার ফলে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যা ওষুধ, কাঁচামাল ও জ্বালানির সরবরাহে স্বস্তি দিয়েছে। তবে মূলধনি পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় শিল্প ও উৎপাদনে বাধা এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট পণ্য আমদানি বেড়েছে ২.৪ শতাংশ হলেও মূলধনি পণ্য আমদানি ১০.২ শতাংশ কমেছে। এতে নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাব দেখা দেয়, যা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চলতি অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, চারজনের মধ্যে এক ব্যক্তি আন্ডারএমপ্লয়েড বা ছদ্মবেকার। তাছাড়া, তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যেখানে মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলস্বরূপ ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ভোগব্যয় সংকুচিত হয়েছে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের শঙ্কা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অতিদারিদ্র্য ৩০ লাখ মানুষ বৃদ্ধি পাবে।
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ফলে নতুন শিল্প বা ব্যবসা কম তৈরি হয়, কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে বাধ্য হয়, চাকরির বাজার সংকুচিত হয়, এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আনতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সেলিম রায়হান বলেন, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া নতুন প্রকল্প ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া কঠিন।
মূলত, বিনিয়োগ অর্থনীতির প্রাণ। দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও আইন স্থিতিশীল থাকলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প শুরু করতে উৎসাহিত হন, যা কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতি পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন শিল্প, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাধাপ্রাপ্ত হয়। নির্বাচন ছাড়া এই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।