বেক্সিমকোর পর সহায়তা চাইছে আরও নয় প্রতিষ্ঠান

প্রতিবেদক: বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ধ কারখানাগুলোর শ্রমিক–কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে সরকারের ঋণসহায়তার পর এবার একের পর এক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই ধরনের সহায়তা চাইছে। গত কয়েক মাসে নয়টি প্রতিষ্ঠান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সুদবিহীন ঋণের আবেদন জমা দিয়েছে।

এ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—দেশবন্ধু গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, ইফাদ গ্রুপ, র‌্যাংগস গ্রুপ, নাইটিঙ্গেল ফ্যাশন, টিএনজেড গ্রুপ, আরএইচ ডেনিম অ্যান্ড রিসাইক্লিং কম্পোজিট, ফাইয়াজ কম্পোজিট ও জেএস লিংক। এর আগে নাসা গ্রুপের একটি আবেদনও মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে।

কেউ শ্রমিক–কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন–ভাতা দিতে, কেউ বকেয়া বেতন–বোনাস পরিশোধ করতে, আবার কেউ বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে ঋণসহায়তা চেয়েছে। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্মিলিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চেয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন,আপাতত মনে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি যৌক্তিক নয়। তবে যদি যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায়, তাহলে নীতিসহায়তা দেওয়া যেতে পারে, তার বেশি কিছু নয়।”

গভর্নরের মতে, বেক্সিমকো গ্রুপকে সহায়তা দেওয়ার পর থেকেই এ ধরনের আবেদন বেড়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিক–কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে ৫২৫ কোটি টাকা সহায়তা দেয়। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় দেয় ৩২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, আর শ্রম মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে দেওয়া হয় ২০০ কোটি টাকা। গত দুই বছরে বেক্সিমকোসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানকে সরকার মোট ৭০৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশবন্ধু গ্রুপ সরকারের কাছে ২ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা চেয়েছে। মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংককে গ্রুপটির আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮৯ সাল থেকে শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশবন্ধু গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কাঁচামাল ও মূলধনের সংকটে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তাদের পাঁচটি কারখানা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতায় চলছে।

যমুনা গ্রুপ শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩,০০০ কোটি টাকার সহায়তা চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চায় ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ পাঁচ বছর মেয়াদি সুদমুক্ত প্রণোদনা ঋণ।

গ্রুপটির দাবি, সাতটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা, পরিষেবা বিল ও অপরিহার্য কাঁচামালের খরচ মেটাতে এই অর্থ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে যমুনা গ্রুপের পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ১৬ অক্টোবর র‌্যাংগস গ্রুপ শ্রম উপদেষ্টার কাছে ৭৫০ কোটি টাকার সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। গ্রুপটি চায় এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সাত বছর মেয়াদি সুদমুক্ত ঋণ।

আবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আমদানি–রপ্তানি সংকটে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়েছে। উচ্চসুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন দিতে হওয়ায় আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।

র‌্যাংগস গ্রুপের উপদেষ্টা সদরুল ইসলাম বলেন,সরকারের কাছে সহায়তা চেয়েছি। আশা করছি, সরকার আমাদের আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।”

ইফাদ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইফাদ অটোস শ্রমিকদের বেতন–ভাতা পরিশোধ ও কারখানা সচল রাখতে ৮৫০ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে ঢাকার ধামরাইয়ে অশোক লেল্যান্ডের সহায়তায় দেশের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে।

টিএনজেড গ্রুপ ঢাকার মহাখালীতে সাততলা ভবন বন্ধক রেখে ৪০ কোটি টাকার ঋণসহায়তা চেয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, সরকার আগেও এই গ্রুপকে ৩৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

প্রতিষ্ঠানটির এক পরিচালক জানিয়েছেন, মূল পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন শামীম বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং গ্রুপটি বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছে।

শতভাগ রপ্তানিমুখী নাইটিঙ্গেল ফ্যাশন বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে ৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুরের জমি ও ভবন বন্ধক রেখে এই সহায়তা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল সালাম বলেন,আমাদের চার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ব্যাংকের অসহযোগিতায় কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের সহায়তা পেলে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।”

এ ছাড়া আরএইচ ডেনিম অ্যান্ড রিসাইক্লিং কম্পোজিট ৫০ কোটি, ফাইয়াজ কম্পোজিট ৩০ কোটি এবং জেএস লিংক ৫০ কোটি টাকার সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে।

এ বিষয়ে শ্রমসচিব সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন,সরকার সরাসরি কোনো ঋণ দেয় না। কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে শ্রমিকদের সহায়তা করা হয়, এটা ঠিক। তবে আবেদনগুলো আসছে বেক্সিমকোকে সহায়তা দেওয়ার পর থেকেই। বেক্সিমকোর সঙ্গে অন্যদের তুলনা করা ঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন,সংকটে না পড়লে তো কেউ আবেদন করত না, এটা ঠিক। এখন কিছু করার থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকই তা করতে পারে।

চাওয়ার পরিমাণ, যুক্তি ও প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়ে সরকার এখন জটিল অবস্থায় পড়েছে। বেক্সিমকোর নজির দেখিয়ে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহায়তার আবেদন করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে বড় আর্থিক নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।