প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতের মোট ১৮ লাখ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা সমস্যাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। তিনি জানান, এর মধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণ এবং ৭ লাখ কোটি টাকা ডিস্ট্রেসড লোন। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০টি স্থানীয় ব্যাংক আছে। এর মধ্যে ১০টি বিশ্বমানের বা আঞ্চলিক মানের হলেও প্রায় ১৫টি ব্যাংক লুটপাটের শিকার হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে এসবের মধ্যে ৫টি জম্বি ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
মাসরুর আরেফিন অভিযোগ করেন, এস আলম গ্রুপ একাই দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের বড় ভূমিকা রেখেছে। তার ভাষায়, একজন মাত্র ব্যক্তি যেমন একটি ব্যাংক ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি এক-দুজন সৎ পরিচালকও একটি ব্যাংকের সফলতার জন্য যথেষ্ট। তিনি আরও উল্লেখ করেন, একসময় দেশে কার্যত দুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল—একটি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত। সেখান থেকেই ১২-১৪টি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন মাহমুদ ওসমান ইমাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আর্থিক খাত সংস্কার অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। জম্বি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি। তিনি প্রস্তাব দেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তন আনা দরকার। এক পরিবারের সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক বোর্ডে থাকতে পারবেন, বোর্ড সদস্যদের মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করতে হবে। পাশাপাশি চেয়ারম্যান ও নির্বাহী চেয়ারম্যানকে মালিকপক্ষের বাইরে থেকে নিয়োগ দিতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা বাড়ে।
প্যানেল আলোচনায় মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক থাকতে হবে—এটি ভালো ব্যাংকের জন্য অপ্রয়োজনীয়। তার মতে, পরিবারভিত্তিক শেয়ার সীমিত করার চেয়ে বেনামি মালিকানা রোধ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ণালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩.৪৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যা ২০২৫ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৪.২ ট্রিলিয়নে। জুন নাগাদ এটি আরও দেড় ট্রিলিয়ন বাড়তে পারে। এতে খেলাপি ঋণ বিতরণকৃত ঋণের ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তিনি বলেন, তারল্য সংকটের কারণে অনেক আমানতকারী টাকা তুলতে পারছেন না, যা ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সংকট।
ব্যাংক এশিয়ার এমডি সোহেল আর কে হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হুইসেলব্লোয়িং নীতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। রেটিং এজেন্সি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ১২টি ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া হয়ে গেছে এবং তারা আমানত ফেরত দিতে পারছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অনিয়মও নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে স্বাধীনতা নয়, বাস্তবেও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীন হতে হবে।