প্রতিবেদক: এখন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বছরভিত্তিক কর্মদক্ষতা (পারফরম্যান্স) মূল্যায়ন করবে সরকার। তাঁদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ, পাশাপাশি আয়োজন করা হবে বিভিন্ন কর্মশালা।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের আর্থিক ও নৈতিক যোগ্যতা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁরা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বয়সসীমা হবে ৪৫ থেকে ৭৫ বছর।
গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ বিষয়ে ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের শেয়ার রয়েছে এমন বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান/পরিচালক নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫’ নামে নতুন নীতিমালা জারি করেছে। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিলের নীতিমালা বাতিল করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, “পরিচালনা পর্ষদকে অধিকতর দক্ষ ও কার্যকর করা, পর্ষদের পেশাদারি নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।”
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক, বিশেষায়িত এবং সরকারি শেয়ারধারী বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রযোজ্য হবে।
নতুন নীতিমালার মূল দিকগুলো
চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা ব্যাংকের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না।
ঋণখেলাপি বা করখেলাপি কেউ পর্ষদ সদস্য হতে পারবেন না।
ন্যূনতম ১০ বছরের প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
ফৌজদারি বা আর্থিক অপরাধ, জালজালিয়াতি বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কেউ যোগ্য হবেন না।
আদালতের রায়ে বিরূপ মন্তব্য থাকলে বা আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিধিমালা লঙ্ঘনের কারণে দণ্ডিত হলে তিনি পর্ষদ সদস্য হতে পারবেন না।
একই ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না।
চেয়ারম্যান নিয়োগের অনুমোদন দেবেন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা; পরিচালক নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা।
পর্ষদে সনদপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক (সিএ), সাবেক জেলা জজ বা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং একজন সাবেক ব্যাংকার রাখার কথা বলা হয়েছে।
পরিচালনা পর্ষদের এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, আমলা এবং দলীয় নেতা–কর্মীদের বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দিয়ে আসছিল। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনীতি বা ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান সীমিত থাকায় সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার।
বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু–এর ২০০৯–১২ মেয়াদে দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হওয়ার পরও তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়—যা রাজনৈতিক প্রভাবের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
২০১৪ সালের পর থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রিতভাবে লোক বাছাই শুরু করলেও, তখনও সাবেক আমলা ও শিক্ষকদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, “নতুন নীতিমালায় কিছু বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে শুধু নীতিমালা করলেই হবে না—এর কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”