প্রতিবেদক: প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্মার্টফোনের দাম অনেক বেশি। ফলে দেশের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, অবৈধভাবে আমদানি হওয়া ফোনের বাজারও বড় হয়ে উঠেছে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) মনে করছে, স্মার্টফোন ব্যবহারের হার কমে থাকা এবং অবৈধ ফোনের বাজার বড় হওয়ার অন্যতম কারণ সরকারের উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ। এ অবস্থায় শুল্ক ও কর কমানোর অনুরোধ জানিয়ে ৫ নভেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি।
চিঠিতে এনবিআরকে জানানো হয়েছে, সরকারের রাজস্ব রক্ষা ও অবৈধ মুঠোফোনের অনুপ্রবেশ রোধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যকর করতে হলে মুঠোফোন আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক ও ভ্যাট কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে বিদ্যমান অননুমোদিত ফোন বৈধকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়েছে কমিশন।
এনবিআরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৮ সালে ফোর-জি যুগে প্রবেশ করলেও স্মার্টফোন ব্যবহারের হার এখনো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। বর্তমানে এ হার আনুমানিক ৬৩ শতাংশ, অর্থাৎ দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থেকেও স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে তাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংস্থাটি মনে করে, স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়াতে এনইআইআর বাস্তবায়ন এবং মুঠোফোনে শুল্ক ও ভ্যাট কমানো অপরিহার্য পদক্ষেপ।
বিটিআরসি বলছে, উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাটের কারণে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোনের সংখ্যা বেড়ে গেছে, যা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফোনের বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার এ খাতে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালু হবে। এ ব্যবস্থায় শুধুমাত্র অনুমোদিত ও বৈধভাবে আমদানি করা ফোনই নেটওয়ার্কে সেবা পাবে। ভবিষ্যতে অবৈধ বা ক্লোন আইএমইআই যুক্ত ফোন আর ব্যবহার করা যাবে না।
বিটিআরসি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে মুঠোফোন উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও ভ্যাটের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যার ফলে ফোনের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সংস্থাটি মনে করে, এনবিআরের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে শুল্কহার যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।
এ উদ্দেশ্যে বিটিআরসি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মাধ্যমে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে। ইতিমধ্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে এক বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা ফোনের ওপর মোট ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য। বিটিআরসি বলছে, এ হার কমানো জরুরি। তবে স্থানীয় উৎপাদন খাতের স্বার্থ রক্ষা করে দেশীয় ও বিদেশি ফোনের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে, যাতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, অবৈধভাবে দেশে ঢুকে পড়া বিপুলসংখ্যক ফোন এনইআইআর কার্যকর হলে নেটওয়ার্কে ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এসব ফোনকে বৈধ ডেটাবেজে যুক্ত করার বিষয়ে এনবিআরের মতামত ও সিদ্ধান্ত চেয়েছে বিটিআরসি।
বিটিআরসি এনবিআরের কাছে তিন বিষয়ে মতামতসহ সিদ্ধান্ত চেয়েছে— স্বল্প সময় দিয়ে অননুমোদিত ফোন বিটিআরসির ডেটাবেজে যুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্কায়নের সিদ্ধান্ত। দেশে উৎপাদিত ও বিদেশ থেকে আমদানি করা মুঠোফোনের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর আশু ব্যবস্থা, দেশীয় ও আমদানিকৃত ফোনের শুল্কের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার পদক্ষেপ।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১৮টি ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বছরে প্রায় ১ কোটি ফিচার ফোন ও ৯০ লাখ স্মার্টফোন উৎপাদন হয়। মুঠোফোন উৎপাদন–সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, দেশে একটি ফোন তৈরি করতে ২০ থেকে ২২ শতাংশ কাস্টম শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হয়, যেখানে বাজারের অর্ধেক অংশ এখনো অবৈধ ফোনে ভরা।
মুঠোফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সহসভাপতি রেজওয়ানুল হক বলেন,
“সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে, তাহলে শুল্ক ও ভ্যাট কমাতে হবে। এতে সরকার এখন যে রাজস্ব হারাচ্ছে, ভবিষ্যতে তা আরও বেশি আদায় করতে পারবে। ফোনের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্ক ও ভ্যাট নির্ধারণ করা উচিত।”