প্রতিবেদক: দেশের ৬০ শতাংশ ব্যাংকেরই সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের কোনো নীতিমালা নেই। মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে নীতিমালা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া এআই ব্যবহার করে ব্যাংক পরিচালনার নীতিমালা নেই ৬৮ শতাংশ ব্যাংকের।
আজ বুধবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতে এআই ব্যবহারের ওপর একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বিআইবিএমের তিন শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির দুই কর্মকর্তা। তাঁরা দেশের ৩৮টি ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। গবেষণার প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের পরিচালক মো. শিহাব উদ্দিন খান। অনুষ্ঠানে অনলাইনে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার। উপস্থিত ছিলেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী, ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডি ওসমান এরশাদ ফয়েজ, বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার অ্যান্ড ডিজাস্টার রিকভারি সাইট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইসহাক মিয়া এবং বিআইবিএমের মহাপরিচালক এস এম আবদুল হাকিম প্রমুখ।
গবেষণায় দেখা যায়, এআই–নির্ভর সাইবার নিরাপত্তা টুল ব্যবহারে ব্যাংকগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) অবকাঠামোর প্রস্তুতি এখনও সীমিত। দেশের ৬৯ শতাংশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা এ ক্ষেত্রে ‘আংশিকভাবে প্রস্তুত’। ১১ শতাংশ ব্যাংক নিজেদের ‘প্রায় প্রস্তুত’ বলেছে, সমানসংখ্যক ব্যাংক জানিয়েছে তারা ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’। তবে ৯ শতাংশ ব্যাংক এখনো কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি।
এ ছাড়া দুর্যোগ পুনরুদ্ধার বা ডিজাস্টার রিকভারি পরিকল্পনায় এআই ব্যবহার করছে মাত্র ৫ শতাংশ ব্যাংক। গবেষণায় অংশ নেওয়া বাকি ৯৫ শতাংশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা এখনো এই ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে না।
মূল প্রবন্ধে বিআইবিএমের পরিচালক মো. শিহাব উদ্দিন খান বলেন, সারা বিশ্বেই আর্থিক খাতসহ প্রায় সব খাতেই আধুনিকায়ন ঘটছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিয়মিতভাবেই সাইবার অপরাধীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। তাই ব্যাংক খাতের নিরাপত্তা জোরদারে এআই ব্যবহারের বিকল্প নেই।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার বলেন, অনলাইন ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ–নির্ভর ব্যাংকিং এখন বিশ্বব্যাপী খাতটির কেন্দ্রবিন্দু। এআই ব্যবহার করলে ব্যাংকগুলো সহজে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারবে, ম্যালওয়্যার ও জালিয়াতি প্রতিরোধও হবে কার্যকরভাবে। তাঁর মতে, সাইবার নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি একটি কৌশলগত বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই ই-ব্যাংকিং, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট–সংক্রান্ত নীতিমালা নিয়মিত হালনাগাদ করছে।
পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী বলেন, “সারা বিশ্ব এআইকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংকিং খাতে এআই দ্রুত প্রসার ঘটাচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। তাই এখন থেকেই এ বিষয়ে আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা নিতে হবে।”
ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডি ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, ব্যাংকগুলোকে আরও আধুনিক হতে হবে, না হলে ব্যাংক–বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার দখল করে নেবে। তিনি বলেন, “এখন নতুন প্রজন্ম ব্যাংকে যেতে চায় না, তারা সব কিছু অ্যাপের মাধ্যমে চায়। তাই সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।” তিনি প্রস্তাব দেন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সচেতনতা বাড়াতে গ্যামিফিকেশন বা খেলার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার অ্যান্ড ডিজাস্টার রিকভারি সাইট লিমিটেডের সিইও মুহাম্মদ ইসহাক মিয়া বলেন, দেশে ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ করলেও তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। তিনি বলেন, “গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো প্রতিষ্ঠান। তাহলে বাকি ২২ ব্যাংকের অবস্থা নিশ্চয়ই আরও দুর্বল। দেশে এখনো ‘আইটি ফর বিজনেস’ ধারণাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, যা আমাদের বড় ঘাটতি।”