প্রতিবেদক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১০ বছর মেয়াদি নতুন রাজস্ব কৌশলের অংশ হিসেবে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
গত রোববার প্রকাশিত “মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল (এমএলটিআরএস)” প্রণয়ন করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা, আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে।
এ কৌশল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপেই এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সংস্থাটির চলমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.৩ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বনিম্নগুলোর একটি। এনবিআর একে ‘উচ্চাভিলাষী’ লক্ষ্য বললেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ পরবর্তী চাহিদা পূরণে এই লক্ষ্য যথেষ্ট নয়।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাড়ে ১০ শতাংশ নয়, আগামী এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত।”
তাঁর মতে, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও বিনিয়োগের বাড়তি চাহিদা মেটাতে এ ধরনের উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রা জরুরি।
তবে তিনি রাজস্ব কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং করদাতাদের হয়রানি বন্ধে সেবার মান উন্নয়নের দিকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পরামর্শ, কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে করদাতাদের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনতে স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
এ কৌশলে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে মধ্যম মেয়াদে এবং ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অর্থনীতির আয়তন বড় হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ২.৬২ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ছিল ৪.৬ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ছিল ৮.৫ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৌশলটিতে প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির কথা বলা হলেও সম্পত্তি, সম্পদ ও উত্তরাধিকার করের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই, যা দুঃখজনক।
তাঁর মতে, রাজস্ব ব্যবস্থায় সমতা আনতে হলে এই খাতগুলোতে অবিলম্বে সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থায় অটোমেশন ও সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দেওয়া প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হলেও, বড় পরিসরের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কেবল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জনবল বাড়ানোর উদ্যোগকে সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়ে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
রাজস্ব কৌশলটির লক্ষ্য নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, এটি উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। আমরা অযৌক্তিক বা অসাধ্য কিছু ধরিনি।তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনা প্রস্তুতের সময় আইএমএফের সঙ্গে পরামর্শ করে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাড়ে ১০ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতের লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে বড় মনে হলেও, এটি মূল্যায়ন করতে হলে আগামী দশকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে।”
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, বিশ্বব্যাংক ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ এবং সরকার ৩.৫ শতাংশ পূর্বাভাস দিয়েছে, যা অতীতের তুলনায় বেশ কম। তাঁর মতে, নিম্ন প্রবৃদ্ধি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়লেও রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত অঙ্ক খুব বেশি বাড়বে না।
তবে তিনি মনে করেন, যেহেতু এই লক্ষ্যমাত্রা সমন্বয়যোগ্য ও পর্যালোচনাযোগ্য, তাই এখনই এটি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পরবর্তী তিন বছর হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন অভ্যন্তরীণ সম্পদের চাহিদা বহুগুণে বাড়বে।
সিপিডি গবেষণা পরিচালক আরও বলেন, “আমার ধারণা, কর আদায় ব্যবস্থায় যে ধরনের সংস্কার বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তা বিবেচনায় না নিয়েই সাড়ে ১০ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “যদি সরকার কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করে, ব্যবসা-বাণিজ্যকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনে এবং করের আওতা বাড়ায়— তাহলে মধ্য মেয়াদেই আমরা এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারি।
এনবিআরের পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে,২০২৫ সালের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার ৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত করদাতাদের কাছ থেকে শতভাগ ভ্যাট রিটার্ন গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।