প্রতিবেদক: ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে, ইরান হুমকি দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা আসবে, যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও রেহাই পাবে না। কারণ, দেশের এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস কাতার ও ওমান, যেখান থেকে আমদানির অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে কাতার থেকে মোট ৪০টি এলএনজি কার্গো আসার কথা, যার মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪টি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সংকট ভবিষ্যতের সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
এমতাবস্থায় পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, “এখনো পর্যন্ত সরবরাহে কোনো সমস্যা হয়নি, তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।”
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি হুমকিতে পড়বে। সেই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে জাহাজগুলো যেতে চাইবে না। এমনকি গেলেও বীমা খরচ অনেক বেড়ে যাবে, ফলে এলএনজির দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে।”
ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। একদিনের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৮.৫ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম ১০০ থেকে ১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে, গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপক। এলএনজির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচও বাড়বে। এতে একদিকে দেশের ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারাও অর্ডার কমিয়ে দিতে পারেন—যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কাতার, সৌদি আরব, আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। এই পথ দিয়েই প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো—ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশ—এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।