প্রতিবেদক: দেশের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের সাতটি কারখানা দীর্ঘ এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে পুনরায় খুলছে।
‘কারখানায় হামলা ও কর্মপরিবেশ না থাকায়’ গত ১৬ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছিল।
গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়,
আগামীকাল থেকে প্যাসিফিক জিনস, জিনস ২০০০, ইউনিভার্সেল জিনস, এনএইচটি ফ্যাশন, প্যাসিফিক অ্যাকসেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার ও প্যাসিফিক অ্যাটায়ার্স—এই সাতটি কারখানা পুনরায় চালু করা হবে।
এসব কারখানায় প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত।
তবে শ্রমিকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে শিল্প পুলিশ ও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।
গত এক বছরে এই কারখানায় অন্তত তিন দফা শ্রমিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, কারখানার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে বহিরাগতদের ইন্ধন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় রপ্তানিতে কোনো বড় প্রভাব পড়েছে কি না—তা নিয়ে এমডি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর কোনো মন্তব্য করেননি।তবে সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে।
বন্ধের সময় কিছু রপ্তানি চালান আটকে ছিল, যা এখন পাঠানো হবে।
বিজিএমইএর পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেছেন,এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে এখন ‘মব সংস্কৃতি’ ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে অস্থিতিশীলতা বাড়বে।”
চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা প্রয়াত এম নাসির উদ্দিন বাংলাদেশের তৈরি জিনস রপ্তানির পথিকৃৎ।
তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ।বর্তমানে তারা জিনসের পাশাপাশি নিট ও ওয়ার্কওয়্যার পোশাক রপ্তানি করছে।তাদের পণ্যের ৯১ শতাংশই জিনস প্যান্ট, যা বিশ্বের ৪৪টি দেশে রপ্তানি হয়।
বড় ক্রেতাদের মধ্যে আছে জাপানের ইউনিক্লো।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে শ্রমিকেরা নিজেদের দাবি-দাওয়ায় বিক্ষোভ শুরু করেন।
এক পর্যায়ে শিল্প পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে, যার জেরে ইপিজেড থানায় মামলা হয়।
তদন্তে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্রমিকেরা ৯ অক্টোবর কর্মবিরতি শুরু করেন।
এর পরপরই বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ১৬ অক্টোবর—যেখানে দুই শ্রমিক নিহত হয়েছে বলে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরই অন্যান্য ইউনিটেও হামলা ও ভাঙচুর শুরু হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।
শিল্প পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, সংঘর্ষের সময় বহিরাগত কয়েকজন ব্যক্তি কারখানায় প্রবেশ করেন।
সিইপিজেডের মূল গেট সংস্কারের কারণে নিরাপত্তা দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, যা কাজে লাগায় বহিরাগতরা।
তাদের কেউ শ্রমিকদের মারধর করেছে, আবার কেউ উসকানি দিয়েছে—দুই পক্ষের বক্তব্যেই পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্র বলছে, ইপিজেড এলাকায় ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ে প্রভাবশালী একটি মহল সক্রিয়।
আগে প্যাসিফিকের ঝুট বাইরে বিক্রি হতো, এখন প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব রিসাইক্লিং ইউনিটে তা ব্যবহার করা হয়।
এই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় ওই মহল শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ।
গত শুক্রবার রাতে এক শ্রমিকের অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে শোনা যায়—বুঝাইতে হবে আমরা ভালো হয়ে গেছি। ভালোভাবে অভিনয় করতে হবে, তারপর যা করার করব।”
এটি শুনে প্রশাসন আরও সতর্ক হয়।
শিল্প পুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন,যাঁরা ভুয়া ভিডিও ও উসকানিমূলক অডিও ছড়িয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্যাসিফিক জিনসের সাত কারখানা পুনরায় চালু হলেও উত্তেজনার আবহ এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
প্রশাসন বলছে, এবার তারা কোনো ‘মব সংস্কৃতি’ বা বাহ্যিক প্রভাবকে প্রশ্রয় দেবে না।
দেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি ফের স্থিতিশীল হতে পারবে কি না—এখন সেই দিকেই তাকিয়ে পোশাক খাতের সবাই।