প্রতিবেদক: চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির ব্যবসায় ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছিল। ভারতের এই অন্যতম শীর্ষ ধনীকে একের পর এক পুরোনো দেনা শোধ করতে হচ্ছিল। কিন্তু একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ঘুষ ও জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত হন আদানি। প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় ব্যাংকগুলো তখন তাঁর ব্যবসায় ঋণ দিতে গড়িমসি করছিল। ঠিক এই সময় নীরবে এগিয়ে আসে ভারত সরকার। ২৪ অক্টোবর (যুক্তরাষ্ট্র সময়) দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে।
ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে থাকা সরকারি নথি বলছে, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (ডিএফএস) রাষ্ট্রায়ত্ত লাইফ ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার (এলআইসি) মাধ্যমে আদানি গ্রুপে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন বা ৩৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে। যদিও এলআইসি মূলত দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে জীবনবিমা সেবা দেয়। একই মাসে আদানির বন্দর ইউনিটের ৫৮৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এর জন্য একটি বন্ড ছাড়ে আদানি গ্রুপ। পরে জানা যায়, পুরো বন্ডে এককভাবে অর্থায়ন করে এলআইসি। বিষয়টি সামনে আসার পর সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন—এটা কি জনগণের অর্থের অপব্যবহার নয়?
নথি ও সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ ছিল সরকারের একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। এর লক্ষ্য ছিল আদানি গ্রুপের প্রতি বাজারের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা। ভারতের করপোরেট খাতের স্বাধীন বিশ্লেষক হেমেন্দ্র হাজারি বলেন, “এই সরকার আদানিকে রক্ষা করবে, তার কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।”
তবে আদানি গ্রুপ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এলআইসি বহু কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে; কেবল আদানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—এ ধারণা বিভ্রান্তিকর। প্রতিষ্ঠানটির আরও দাবি, এলআইসি আদানি গ্রুপে বিনিয়োগ করে মুনাফা করেছে এবং তাদের প্রবৃদ্ধি মোদি সরকারের আগেই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সরকারি গবেষণা সংস্থা নীতি আয়োগ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। নথিতে দেখা যায়, নীতি আয়োগ, এলআইসি ও ডিএফএস মিলে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদানির বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের অভিযোগ আনে। একই দিনে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) আদানির বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের মামলা করে। আদানি গ্রুপ জানায়, এই অভিযোগ ‘ব্যক্তির বিরুদ্ধে’, কোম্পানির নয়। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে শেয়ার কারচুপি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে। এ ঘটনায় ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি তদন্ত শুরু করে। সেবি দুটি অভিযোগ খারিজ করলেও এখনো কিছু তদন্ত চলছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এলআইসিকে প্রায় ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আদানি করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুপারিশ করে এবং আরও ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে অংশীদারত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, সরকারি ১০ বছরের বন্ড থেকে আয় তুলনামূলক কম ছিল। তবে এলআইসি কোন কোন কোম্পানিতে অংশীদারি বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অস্ট্রেলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলি বলেন, “ভারত সরকারের সমর্থন থেকে বোঝা যায়, আদানি ভিন্ন নিয়মে ব্যবসা চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। স্বজনতোষণনির্ভর পুঁজিবাদ এখনো বেঁচে আছে এবং দারুণভাবে চলছে।”
গৌতম আদানির ব্যবসার শিকড় ভারতের গুজরাটে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানও ঘটেছে। ১৯৯১ সালে মুন্দ্রা বন্দরের সূচনা থেকেই মোদি–আদানির সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় মোদির বিমান ব্যবহার করেছিলেন আদানি। বিরোধীরা বরাবরই এই ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা করে এসেছে। বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে আদানির প্রভাব বিস্তৃত—দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ২৭ শতাংশ তাঁর বন্দরের মাধ্যমে হয়, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তিনি সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিনিয়োগকারী, এমনকি ২০২২ সালে অধিগ্রহণ করেন এনডিটিভি। এক সময় তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর তালিকাতেও উঠে আসেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, এলআইসির বিনিয়োগের বড় অংশ আদানি গোষ্ঠীর দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে যায়—আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড এবং আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড। ভারতীয় সংস্থাগুলোর হিসাবে এই দুটি কোম্পানির ঋণমান যথাক্রমে ‘AAA’ ও ‘AA’। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিচ রেটিংস এই দুই প্রতিষ্ঠানের ঋণমান দিয়েছে মাত্র ‘BBB–’। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের আইনবিশেষজ্ঞ কুশ আমিন বলেন, “এলআইসি দরিদ্র মানুষের জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান। এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ তাদের দায়িত্ব ও নীতির পরিপন্থী।”
আদানি গোষ্ঠী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের বন্দর, সিমেন্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন খাতের কোম্পানিগুলোর ঋণ–নির্ভরতা কমছে এবং তাদের ঋণমান ‘AAA’। তবে কোন সংস্থা এই মূল্যায়ন দিয়েছে, তা তারা উল্লেখ করেনি।
অস্ট্রেলীয় গবেষক টিম বাকলি বলেন, “যখন আদানি নানা আইনি ও আর্থিক চাপে আছেন, ঠিক সেই সময় সরকারের সমর্থন তাঁকে কার্যত রক্ষা করছে। যদি সরকারের কাছ থেকেই বারবার আর্থিক সহায়তা পান, তাহলে তাঁর নিজের সম্পদ বিক্রির প্রয়োজনই বা কেন হবে? শেষ পর্যন্ত ভারতের জনগণকেই তাঁকে উদ্ধার করতে হচ্ছে।