প্রতিবেদক: বিশ্বের কোথাও সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নজির নেই। তবে বাংলাদেশে সেই উদ্যোগের আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ব্যাংকের নামও ঠিক করা হয়েছে— ‘সরকারি কর্মচারী ব্যাংক’।
জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের দেশের ‘বেতনভোগী একটি টেকসই শ্রেণি’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের জন্য এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ভাবনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে গত ২৭ জুলাই জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে সরকার। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বেতন কমিশনের সভাপতি জাকির আহমেদ খান জানান, “সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংক গঠনের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সুপারিশ থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ধারণা নতুন নয়। ফরাসউদ্দিন কমিশনও একসময় সরকারি কর্মচারীদের জন্য একই রকম প্রস্তাব দিয়েছিল।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন ২০১৪ সালে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘সমৃদ্ধির সোপান ব্যাংক’ নামে একটি প্রস্তাব দেয়। রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছাকাছি সরকারি জমি বিক্রি করে ৪০০ কোটি টাকা মূলধনে ব্যাংকটি গঠনের প্রস্তাব ছিল, যদিও পরে বিষয়টি আর এগোয়নি।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন,
“চিন্তাটির কথা শুনে আমি অবাক হয়েছি। দুনিয়ার কোথাও এ রকম ব্যাংক নেই। দেশে যত ব্যাংক আছে, সেগুলোই বেশি। নতুন ব্যাংক করার চিন্তা থেকে সরে এসে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম আরও উন্নত করা উচিত।”
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও একই মন্তব্য করেছেন— বিশ্বের কোথাও সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা ব্যাংকের কোনো উদাহরণ নেই।
বেতন কমিশনের সদস্যদের যুক্তি, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার–ভিডিপির জন্য আলাদা ব্যাংক রয়েছে। তাই ২০ লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্যও একটি ব্যাংক থাকা যৌক্তিক।
তাঁরা আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে বদলি হলে হিসাব পরিবর্তন ও বেতন পেতে দেরি হয়। শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংক থাকলে এই জটিলতা কমবে।
এছাড়া ব্যাংকটি থেকে স্বল্পসুদে ঋণ, যেমন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বা বিয়ের জন্য ঋণ, গৃহনির্মাণ ঋণ ইত্যাদি সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
কিছু সদস্য আবার প্রস্তাব দিয়েছেন, বিদ্যমান কোনো দুর্বল ব্যাংককে সরকারি কর্মচারী ব্যাংকে রূপান্তর করা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় চারটি বিশেষ ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালে আনসার–ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক,১৯৯৯ সালে ট্রাস্টব্যাংক(সেনাবাহিনী),২০১৬ সালে সীমান্ত ব্যাংক (বিজিবি) এবং২০১৯ সালে কমিউনিটি ব্যাংক (পুলিশ) লাইসেন্স পায়।
বর্তমানে দেশে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত। অনেক বিশেষায়িত ব্যাংক রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে— এবং সেগুলোর মধ্যে লুটপাট ও অনিয়মের নজিরও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা ও বিদ্যমান অনিয়মের প্রেক্ষাপটে নতুন ব্যাংক গঠন ঝুঁকিপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। বরং বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বচ্ছ ও দক্ষ করার দিকেই সরকারের নজর দেওয়া উচিত।