প্রতিবেদক: বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পাটপণ্যের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক (কাউন্টারভেলিং ডিউটি বা সিভিডি) আরোপের লক্ষ্যে ভারত যে তদন্ত শুরু করেছে, তা অযৌক্তিক ও অনিয়মতান্ত্রিক—এমন অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ও বাংলাদেশ পাটকল সমিতি (বিজেএমএ)।
তাদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে পরামর্শ সভা না করে এ ধরনের তদন্ত শুরু করা যায় না। কিন্তু ভারত সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তদন্ত শুরু করেছে। এর ফলে দেশটি ডব্লিউটিওর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির ১৩ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করেছে।
বিটিটিসি আজ রোববার এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিচালকের দপ্তরের (ডিজিটিআর) সঙ্গে পরামর্শ সভা আহ্বানের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ যেন পুনরায় চিঠি পাঠায়। প্রস্তাবিত সভাটি হতে পারে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিটিটিসির চিঠি পেয়েছি। আমরা নির্দিষ্ট সময় প্রস্তাব করব না; বরং অনুরোধ করব ভারত যেন পরামর্শ সভার জন্য সময় নির্ধারণ করে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতের কাছে পরামর্শ সভার সময় চাওয়ার চিঠি পাঠাবে।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগ গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর সিভিডি আরোপের লক্ষ্যে তদন্ত শুরুর নোটিশ জারি করে।
এর আগে ২১ আগস্ট ভারত ই-মেইলের মাধ্যমে ২ সেপ্টেম্বর পরামর্শ সভায় বসার আহ্বান জানায়। বাংলাদেশ ২৯ আগস্ট জানায়, সভার প্রস্তুতির জন্য ৬০ দিন সময় প্রয়োজন, তবে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি।
তদন্তটি ভারতের পাটকল সমিতি (আইজেএমএ) এবং এ.পি. মেস্তা টোয়াইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (এজেএমএ) যৌথ আবেদনের ভিত্তিতে শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারত অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশের ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) ও ইজেড (অর্থনৈতিক অঞ্চল)-এর পাটপণ্য উৎপাদকরা নানা ধরনের ভর্তুকি পাচ্ছেন—যেমন কর অবকাশ, সস্তা বিদ্যুৎ, নগদ সহায়তা, এবং যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়।
কিন্তু বিটিটিসি, বিজেএমএ ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অমূলক বলে দাবি করেছে। তাদের মতে, দেশের কোনো ইপিজেড বা ইজেডে পাটপণ্য উৎপাদনের কারখানাই নেই, ফলে ভর্তুকি পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বিটিটিসির চেয়ারম্যান মইনুল খান বলেন, “ভারত যে ১২টি ভর্তুকি কর্মসূচির কথা বলছে, তা পাটপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাছাড়া যেসব পাটপণ্যের ওপর ইতিমধ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক চলছে, সেই একই পণ্যে আবার ভর্তুকির অভিযোগ তোলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
২০১৮ সালে ভারত বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে, যা প্রথমে পাঁচ বছরের জন্য ছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে এই শুল্কের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়।
বর্তমানে প্রতি টন পাটপণ্যে ৬ ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপিত রয়েছে।
বিজেএমএর চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, “ভারত গায়ের জোরে এসব করছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ২০২০ সালেও তারা একই অভিযোগ তুলেছিল, পরে পরামর্শ সভার মাধ্যমে বিষয়টি মিটে যায়। আসলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট প্রতিবাদ না থাকায় ভারত এভাবে পদক্ষেপ নিতে সাহস পায়।”