জ্বালানি সাশ্রয় আর কম দামে এসইউভি জনপ্রিয়তার শীর্ষে

প্রতিবেদক: দেশের রাস্তায় চলাচলকারী গাড়িগুলোর বড় অংশই জাপানি ব্র্যান্ড টয়োটা’র। নির্ভরযোগ্যতা, সহজ রক্ষণাবেক্ষণ ও কম খরচে যন্ত্রাংশ পাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে টয়োটার গাড়ির চাহিদা সর্বাধিক। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে টয়োটার এসইউভি মডেল ‘করোলা ক্রস’ বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হাইব্রিড ইঞ্জিন হওয়ায় এই গাড়ি জ্বালানিসাশ্রয়ী, ফলে বিক্রিও দ্রুত বাড়ছে।

গাড়ি ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় টয়োটার সেডান মডেল ‘এলিয়ন’ ও ‘প্রিমিও’-এর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি ছিল। তবে জাপানে ২০২১ সালের পর এই দুই মডেলের উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমদানি কমেছে। বর্তমানে একটি প্রিমিও গাড়ির দাম ৪৫ থেকে ৪৮ লাখ টাকা পর্যন্ত, অথচ তুলনামূলক কম দামে ৪০–৪৫ লাখ টাকায় মিলছে করোলা ক্রস—একটি পূর্ণাঙ্গ এসইউভি, যা দেখতে জিপের মতো এবং ব্যবহারিক দিক থেকেও আরামদায়ক।

এসইউভি গাড়ির ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, করোলা ক্রস প্রতি লিটার জ্বালানিতে মহাসড়কে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং শহরের ভেতরে ১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে। জ্বালানি খরচ কম হওয়ায় এই গাড়ির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা আইনজীবী সোহেল রানা, যিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৪ লাখ টাকায় করোলা ক্রস কিনেছেন, বলেন—৩৬ লিটারের ট্যাংক ভর্তি করলে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার চলা যায়। গাড়ির ভেতরে জায়গা বেশি এবং দীর্ঘ ভ্রমণে বেশ আরামদায়ক। এছাড়া একবার ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করলে ৭ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত চালানো যায়।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘স্কাই ট্রি’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালে তারা ৮০টি করোলা ক্রস বিক্রি করে। ২০২৪ সালে বিক্রির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০-তে। চলতি বছরে অক্টোবর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ১১০টি, আর বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৩৪টি গাড়ি।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মশিউর রহমান বলেন,করোলা ক্রসের জ্বালানি খরচ প্রিমিওর তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। দামও তুলনামূলক সাশ্রয়ী, তাই দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।

বারভিডা’র সহসভাপতি ও ট্রাস্ট অটোর স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম বলেন,এসইউভি গাড়ির মধ্যে করোলা ক্রসের দাম সবচেয়ে কম। শহরেও এর মাইলেজ ১৫ কিলোমিটারের বেশি, তাই ক্রেতাদের কাছে এটি এখন অন্যতম পছন্দের গাড়ি।”

এই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, করোলা ক্রসের প্রধান ক্রেতারা হচ্ছেন করপোরেট পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তা। রাজধানীর বিভিন্ন গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বলছে, তাদের মোট বিক্রির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এখন করোলা ক্রস গাড়ি।

সেডান, হ্যাচব্যাক ও ওয়াগন—এই তিন ধরনের করোলা সিরিজের বাইরে ২০২০ সালে টয়োটা যুক্ত করে নতুন এসইউভি মডেল ‘করোলা ক্রস’।
বাংলাদেশে এখন এই গাড়ির দুটি সংস্করণ পাওয়া যায়—জাপানি (রিকন্ডিশন্ড) ও থাই সংস্করণ (টয়োটা বাংলাদেশের অফিসিয়াল শোরুমে বিক্রিত)।

গাড়িটিতে রয়েছে পরিচিত করোলা ড্যাশবোর্ড ও ৮ ইঞ্চি টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, যাতে অ্যাপল কারপ্লে সুবিধা আছে। বুট স্পেস ৪৮৭ লিটার, যা সিট ভাঁজ করলে আরও বাড়ানো যায়।

এতে ব্যবহৃত হয়েছে ১.৮ লিটার হাইব্রিড ইঞ্জিন, যা জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং কনটিনিউয়াসলি ভ্যারিয়েবল ট্রান্সমিশন (CVT) গিয়ারের সঙ্গে সমন্বিত। গাড়িটি ফ্রন্ট হুইল ড্রাইভ (FWD) ও অল হুইল ড্রাইভ (AWD) উভয় সংস্করণেই পাওয়া যায়। দেশে এর দাম ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক সংগঠন বারভিডা’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯–২০ অর্থবছরে দেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছিল ১,২০৯টি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,৩৯২টি।

বিআরটিএ’র তথ্য বলছে, ২০২০ সালে দেশে এসইউভি নিবন্ধিত হয়েছিল ৪,৮৮৮টি, আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮,৬৪৮টি—অর্থাৎ পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ।

২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে টয়োটা ব্র্যান্ডের প্রায় ২৩ হাজার এসইউভি গাড়ি, যা বাজারে টয়োটার একচ্ছত্র আধিপত্যের ইঙ্গিত দেয়। এর পরেই রয়েছে নিশান, প্রায় ৬ হাজার নিবন্ধন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে।

এইচএনএস অটোমোবাইলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন,দেশে এখন সামগ্রিকভাবে গাড়ি বিক্রি ধীরগতিতে থাকলেও এসইউভি গাড়ির বিক্রি বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে টয়োটার করোলা ক্রস।”