প্রতিবেদক: সদরঘাট টার্মিনাল পেরিয়ে আহসান মঞ্জিল পর্যন্ত যেতেই চোখে পড়ে ব্যস্ত জনপদ—হাঁকডাক, ফলের স্তূপ, কাভার্ড ভ্যানের সারি আর আড়তের কোলাহল। এ দৃশ্য রাজধানীর ঐতিহাসিক বাদামতলী বাজারের, যেখানে প্রতিদিন শতকোটি টাকার ফলের বেচাকেনা হয়।
বাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, কাকডাকা ভোরেই শুরু হয় কার্যক্রম। সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর থেকে ফলবাহী কাভার্ড ভ্যানগুলো একের পর এক ঢোকে বাজারে। সকাল ছয়টা থেকে সাধারণ ক্রেতার আনাগোনাও বাড়তে থাকে। দুপুর পর্যন্ত চলে এই বেচাকেনা, যেখানে আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ যুক্ত থাকেন প্রতিদিন।
বাদামতলী ঢাকার প্রাচীনতম পাইকারি বাজারগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৩৫ সালের দিকে কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে এখানে ফলের পাইকারি বেচাকেনা শুরু করেন। তখন দেশীয় ফলের পাশাপাশি ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কিছু ফল বিক্রি হতো।
স্বাধীনতার পর বাজারটির ধরন পাল্টে যায়। ধীরে ধীরে দেশীয় ফলের পরিবর্তে বিদেশি ফলের আধিপত্য তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুদ্দিন আহমেদ জানান, এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানি করা হয়, যার বেশির ভাগ আসে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে। এসব ফলের বড় অংশ আগেই অনলাইনে বিক্রি হয়ে যায়, ফলে বাদামতলীতে সরাসরি বেচাকেনা কিছুটা কমেছে। তবে ব্যবসার পরিধি বেড়েছে, কারণ পাইকারি ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বাদামতলী ফলবাজারে প্রধানত তিন শ্রেণির ব্যবসায়ী রয়েছেন—আমদানিকারক, ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগী,পাইকারি বিক্রেতা।
সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, বাদামতলীকেন্দ্রিক বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০০, এর মধ্যে বড় আমদানিকারক শতাধিক। এছাড়া রয়েছে প্রায় ৫০০ পাইকারি ও ফড়িয়া দোকান এবং ৮–১০টি হিমাগার।
প্রতিদিন প্রতি দোকানে ৩০–৪০ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। সেই হিসেবে বাজারজুড়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১৫০–২০০ কোটি টাকা। তবে ব্যবসায় মন্দা গেলে লেনদেন নেমে আসে ৫০–৬০ কোটি টাকায়, জানালেন সংগঠনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম।
খেজুর বাদে দেশে বছরে দুই থেকে আড়াই লাখ টন ফল আমদানি হয়, আর খেজুরের পরিমাণ প্রায় ৮৫–৯০ হাজার টন।
সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় মাল্টা, এরপর আপেল, কমলা ও আঙুর।
মাল্টা আসে মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীন থেকে।আপেল ও কমলা আসে চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত থেকে।আঙুর আসে চীন ও ভারত থেকে।
মোট আমদানি করা ফলের ৬০–৭০ শতাংশই এই চার ফলের দখলে।
এ ছাড়াও ভারত ও মিসর থেকে আসে বেদানা, চীন থেকে নাশপাতি, আর আকাশপথে আসে অ্যাভোকাডো, চেরি ও অন্যান্য প্রিমিয়াম ফল।
খেজুর আসে সৌদি আরব ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে।
বাদামতলীতে ফলের দাম প্রতিদিনই ওঠানামা করে। সাধারণত কার্টন বা ক্যারেট হিসেবে ফল বিক্রি হয়।
উদাহরণস্বরূপ-মাল্টা (১৫–১৬ কেজি কার্টন): ৩,৩০০–৩,৬০০ টাকা,সবুজ আপেল: ২৪০–৩৬০ টাকা/কেজি ,লাল আপেল: ২০০–২৫০ টাকা/কেজি,আঙুর: ৩৫০–৪০০ টাকা/কেজি ,কমলা: ২২০–২৫০ টাকা/কেজি ,আনার: ৩৫০–৪০০ টাকা/কেজি, নাশপাতি: ২০০–২২০ টাকা/কেজি ,ড্রাগন ফল: ১২০–১৭০ টাকা/কেজি
খুচরা বাজারে অবশ্য দাম কিছুটা বেশি—মাল্টা ২৫০–২৮০, আপেল ৩০০–৪০০, কমলা ৩০০–৩২০ টাকায় বিক্রি হয়।
বাজারের একটি বৈশিষ্ট্য হলো নিলাম পদ্ধতি। দীর্ঘদিন বিক্রি না হওয়া ফল দ্রুত বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হয়, যেখানে পাইকারির চেয়ে কিছুটা কম দামে ফল বিক্রি হয়।
ফল ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে ফল আমদানিতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, পাশাপাশি উচ্চ শুল্কের কারণে লাভ কমে গেছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে শুল্ক বেশি, প্রতিযোগীও অনেক। এতে লাভ কমে গেছে। আর বাদামতলীর সরু রাস্তার কারণে কাভার্ড ভ্যান প্রবেশে অসুবিধা হয়। সকাল আটটার পর ভ্যান ঢুকতে না পারলে এক দিন অপেক্ষা করতে হয়, এতে আর্থিক ক্ষতি হয়।
এ ছাড়া হিমাগারের স্বল্পতা বাজারের আরেক বড় সমস্যা বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
প্রায় শতবর্ষ পুরোনো বাদামতলী বাজার শুধু ফল নয়, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যও বটে। প্রযুক্তি ও সময়ের পরিবর্তনে বেচাকেনার ধরন পাল্টালেও বাদামতলী এখনো দেশের পাইকারি ফল ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু।