প্রতিবেদক: বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানটি দখল করে আছে দক্ষিণ কোরীয় ব্যবসায়ী কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন ইয়াংওয়ান করপোরেশন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশীয় উদ্যোক্তা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদের মালিকানাধীন হা-মীম গ্রুপ।
ইয়াংওয়ান ও হা-মীম ছাড়াও রপ্তানিতে সেরা দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে মণ্ডল গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ ও মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ।
এই দশ গ্রুপের মধ্যে নয়টির রপ্তানি ৯০ থেকে ১০০ শতাংশই তৈরি পোশাকনির্ভর। ব্যতিক্রম শুধু প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, যাদের রপ্তানিতে রয়েছে কৃষিপণ্য, আসবাব, প্লাস্টিক, জুতা ও হালকা প্রকৌশল পণ্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তৈরি এই তালিকা অনুযায়ী, মোট ৪৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির মধ্যে শীর্ষ দশ গ্রুপের অবদান ৫ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার—মোট রপ্তানির প্রায় ১১ শতাংশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন ইয়াংওয়ান করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরেই রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি ৯৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।
ইয়াংওয়ানের রপ্তানির ৯৪ শতাংশই তৈরি পোশাক—বিশেষ করে উচ্চমূল্যের জ্যাকেট, যার একটি জ্যাকেটের রপ্তানি মূল্য ৪৪৮ ডলার পর্যন্ত। তারা অ্যাডিডাস, রাল্ফ লরেন, লুলুলেমনসহ ৪৮টি দেশে পোশাক রপ্তানি করে।
কিহাক সাং বলেন, “আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১০–১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছি। তবে লিড টাইম কমানো গেলে রপ্তানি আরও বাড়বে। এজন্য বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।”
হা-মীম গ্রুপ দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তারা ৬৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।
তাদের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে রপ্তানি হয়েছে মোট ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের পোশাক। গ্যাপ, এইচঅ্যান্ডএম, আমেরিকান ইগল, লেভি’সসহ বহু ব্র্যান্ড তাদের ক্রেতা।
এ কে আজাদ বলেন, “আমরা বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যে কাজ করছি। পোশাকের দাম কমে যাওয়ায় মুনাফা কমেছে, তবুও উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখব।
মণ্ডল গ্রুপ গত অর্থবছরে ৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে—১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বছরে ২৬ কোটি পিস পোশাক রপ্তানির মানে দিনে গড়ে ৭ লাখের বেশি পোশাক রপ্তানি।
গ্রুপটির নেতৃত্বে আছেন আবদুল মমিন মণ্ডল, যিনি বলেন, “ময়মনসিংহে নতুন কারখানা অধিগ্রহণ করেছি, শিগগিরই উৎপাদন শুরু হবে।
ডিবিএল গ্রুপের রপ্তানি ৫২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাক ছাড়াও তারা ওষুধ ও সিরামিক খাতে কাজ করছে। ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, “পশ্চাৎ সংযোগশিল্পে বিনিয়োগ করছি, রপ্তানিতে ৫–১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করছি।
অনন্ত গ্রুপ গত অর্থবছরে ৪৬ কোটি ২১ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। নরসিংদীতে নতুন সিনথেটিক কাপড়ের কারখানা স্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি, যা ডিসেম্বরেই উৎপাদনে যাবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহির বলেন, “বৈশ্বিক শুল্ক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের এগোতে হবে।
ষষ্ঠ স্থানে থাকা প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ রপ্তানি করেছে ৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য, যা ১২ শতাংশ বেশি। তাদের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আছে খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিকস, আসবাব, খেলনা, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য।
চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, “আমাদের রপ্তানির পরিধি বাড়াতে উৎপাদনের গতি আরও ত্বরান্বিত করছি।”
স্কয়ার গ্রুপ সপ্তম অবস্থানে, রপ্তানি করেছে ৪৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার—২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ ও প্রসাধনও রপ্তানি করে তারা।
তপন চৌধুরী বলেন, “উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করছি। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।”
দুই বছর মন্দার পর পলমল গ্রুপ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাদের রপ্তানি ৪০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
গ্রুপটির নেতৃত্বে আছেন নাফিস সিকদার। ১০টি কারখানায় বছরে প্রায় ১৫ কোটি পিস পোশাক রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি।
চট্টগ্রামের প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের রপ্তানি ৪০ কোটি ৬১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেড়েছে। তাদের প্রধান ক্রেতা জাপানের ইউনিক্লো। প্রয়াত উদ্যোক্তা মো. নাসির উদ্দিনের হাতে বাংলাদেশের জিনস পোশাক রপ্তানি শুরু হয়েছিল।
মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ গত অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানির ৯৮ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নভিত্তিক।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, “রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় নতুন বিনিয়োগে আপাতত সতর্ক নীতি নিচ্ছি।”
আগের বছরের শীর্ষ দশে থাকা বেক্সিমকো ও স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ এবার তালিকায় নেই। বেক্সিমকোর রপ্তানি ৭৯ শতাংশ কমে গেছে, আর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন।”