প্রতিবেদক: দোকানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ক্রেতার চোখে পড়ল—দামের ট্যাগে লেখা ৯৯৯ টাকা। তাঁর মনে হলো, হাজার টাকার নিচে পণ্য পেয়ে যেন বেশ সাশ্রয় হয়েছে। কিন্তু দোকান থেকে বেরিয়ে আসতেই বুঝলেন, আসলে তো মাত্র ১ টাকাই কম!
এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। যেমন মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম রাখা হয় ১৪৯ টাকা, ১৯৯ টাকা—পুরো ১৫০ বা ২০০ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে আইফোনের দামও দেখা যায় ৭৯৯ বা ১০৯৯ ডলার। দেশের সুপারশপগুলোতেও এমন কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এটি আসলে ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার একধরনের মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ক্রেতার মনে হয়, তিনি কিছুটা কম দামে পণ্য কিনছেন—যদিও পার্থক্য মাত্র ১ বা ২ টাকা। এই মানসিক প্রতিক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘প্ল্যাসিবো ইফেক্ট’।
‘প্ল্যাসিবো ইফেক্ট’ এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি মনে করেন তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়েছে, অথচ বাস্তবে পরিবর্তন সামান্যই। চিকিৎসাক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়—যেমন, অনেক সময় রোগীকে প্রকৃত ওষুধের বদলে আটার বা চিনির বড়ি দেওয়া হয়, তবুও তিনি কিছুটা সুস্থ অনুভব করেন, কারণ মস্তিষ্ক বিশ্বাস করে ওষুধটি কার্যকর।
ধরা যাক, কোনো পণ্যের দাম ৪০০ টাকার পরিবর্তে রাখা হলো ৩৯৯ টাকা। এই ১ টাকার ফারাকই ক্রেতার মনে তৈরি করে ভিন্ন অনুভূতি। তাঁর মনে হয়, তিনি ৪০০ নয়, ৩০০ টাকার ঘরে থাকা পণ্য কিনেছেন। আর ৯৯৫ বা ৯৯৯ টাকায় দাম রাখলে তা মনে হয় আগের ধাপের মধ্যে—যেনো বড় অঙ্কে পা পড়েনি।
এই কৌশলকে বলা হয় ‘লেফট ডিজিট ট্যাকটিকস’, অর্থাৎ সংখ্যার বাম দিকের অঙ্কের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় সংখ্যার প্রথম অঙ্কে। ফলে ৯৯৯ টাকা দেখে মনে হয়, দাম “৯০০ টাকার ঘরে”, যদিও বাস্তবে তা ১০০০ টাকার সমান। বিক্রেতারা এই ভুল ধারণার সুযোগই দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান।
কেনাকাটার সিদ্ধান্তই বিক্রেতার মূল লক্ষ্য। মেটলাইফের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা সাইফুর রহমান বলেন, “পণ্য বিপণনে বিক্রেতারা এমনভাবে দাম নির্ধারণ করেন যাতে ক্রেতার কেনার সিদ্ধান্ত সহজ হয়।” তাঁর মতে, এই কৌশল যেমন বিলাসপণ্য (যেমন মোবাইল ফোন)-এর ক্ষেত্রে কার্যকর, তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (যেমন মোবাইল রিচার্জ)-এর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
তিনি আরও বলেন, “মানুষ সংখ্যা বোঝার সময় সবচেয়ে বামের সংখ্যাটিকে গুরুত্ব দেয়। সে কারণে ১০৯৯ টাকাকে আমরা ১০০০ টাকার কাছাকাছি মনে করি, আর ৪৯৯ টাকাকে ৪০০ টাকার মতো মনে হয়। ফলে ক্রেতা মনে করেন তিনি কম দামে কিনছেন, যা বিক্রির সম্ভাবনা বাড়ায়।”
আরেকটি দিক হলো—সব ক্রেতার কাছে খুচরো টাকা থাকে না। ফলে ১৯৮ বা ১৯৯ টাকার পণ্য কিনলে বিক্রেতা যদি খুচরা না দেন, ক্রেতা সাধারণত কিছু বলেন না। মনে করেন, “মাত্র ১–২ টাকাই তো।” কিন্তু প্রতিটি বিক্রয়ে এমন হলে ছোট দোকানদারদের জন্য এটি হয়ে ওঠে অতিরিক্ত লাভের উৎস।
সব মিলিয়ে, ১ টাকার পার্থক্যই বিক্রেতার জন্য লাভজনক ও ক্রেতার জন্য মানসিক সান্ত্বনা—যা আসলে আধুনিক বিপণনের এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।